মাভাবিপ্রবি নিয়ে জাফর ইকবাল স্যারের লেখা, শিক্ষকদের প্রতিবাদ ও ছাত্রদের অভিব্যক্তি


আপনারা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রীরা ক্লাস করলেও আপনারা বেতন পাবেন, না করলেও পাবেন। এ কারনে ৩০০ ছাত্রের ভবিষ্যত নিয়ে আপনাদের কোন মাথাব্যাথা নেই। কেন তারা এই আন্দোলন করছে, তা কি ভেবে দেখেছেন?

যদি সিলেবাসের ১০-১৫% পরিবর্তন করে শিক্ষার্থীদের একটি যুগোপযোগী আধুনিক ডিগ্রি দেয়া যায়, তাহলে সে যৌক্তিক দাবী তারা করতেই পারে। এ কারনে তাদের নামে বহিষ্কারাদেশ, মধ্যযুগীয় কায়দায় পুলিশি নির্যাতন, গ্রেফতার করতে হবে কেন? ছাত্রদের কি কি কর্মসূচী ছিল তা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবাই জানেন, এই কারনে তাদের বিরূদ্ধে চুরির মামলা দিতে আপনাদের বিবেকে বাধল না। আপনারা কি আপনাদের ছাত্রদের চোর বানাবার শিক্ষা দিচ্ছেন?

জাফর ইকবাল স্যারের লেখার ব্যাপারে আপনারা প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন,

“ ২৫ মে প্রথম আলোয় সাদাসিধে কথায় ‘ভাসানী বিশ্ববিদ্যালয় এবং আমরণ অনশন’ শিরোনামের লেখায় শ্রদ্ধেয় মুহম্মদ জাফর ইকবাল মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষকদের সঙ্গে ছাত্রছাত্রীদের সম্পর্কের যে মেরুকরণ করেছেন, তার সঙ্গে আমরা দ্বিমত পোষণ করছি। ”

জাফর স্যারের ব্যাপারে নতুন করে বলার কিছু নেই, আমরা সবাই তার ব্যাপারে জানি। জাফর স্যার ন্যায়ের পক্ষে কথা বলেছেন, কিন্তু তা আপনাদের বিপক্ষে গেছে। তাই বলেই তার কথা বিরোধিতা করতে হবে? আপনারা আপনাদের স্বপক্ষে জোরালো যুক্তি দিতে পারেন নি। ছাত্র শিক্ষকের সম্পর্কের মেরুকরন তো আপনারাই করছেন। তাদের নামে মিথ্যা মামলা দিচ্ছেন। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রকে কেন ডিগ্রি পরিবর্তন করার দাবীর অপরাধে জেলে রাত কাটাতে হবে? ফুড সহ অন্যান্য ডিপার্টমেন্টের ছেলেদের কেন মেস থেকে পুলিশ ধরে নিয়ে যাবে? এসকল প্রশ্নের উত্তর আপনারা কার কাছে দেবেন?

তাদের বিরুদ্ধে আপনারা যে সব অন্যায় আচরন করেছেন তার বর্ণনা দিতে গেলে মহাকাব্য হয়ে যাবে। আগ্রহীরা চাইলে www.ftns2fe.webs.com ঠিকানায় বিস্তারিত দেখতে পারেন।

এ তো গেল ফুড ডিপার্টমেন্টের কথা। এই বিষয় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অন্যান্য ডিপার্টমেন্টের ছেলেদের সাথেও অন্যায় আচরন করেছে। তাদের এ সমস্যার যাতে দ্রুত সমাধান হয় এজন্য মানববন্ধন করতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আমাদের বলেন,

“ আপনারা যদি ফুডের ব্যাপারে কোন স্টেপ নেন, তাহলে আমি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেব। এতে আপনাদেরই ক্ষতি। আমার কিছুই হবে না। ”

বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয় মানববন্ধন করার কারনে বন্ধ হয়ে গেছে আমার জানা নেই। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তার অযোগ্যতা ঢাকার জন্য বহিষ্কারাদেশ দিয়েই যাচ্ছে। কোন ছাত্র কিছু বলতে চাইলে প্রথমেই তাকে বহিষ্কারের হুমকি দিয়ে বলা হয়- ‘তোমার আইডি কত?’

ছাত্ররা আপনাদের বিরুদ্ধে কোন কথা বললেই আপনারা তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অনৈতিক পদক্ষেপ নেন। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৭০০ ছাত্রের মধ্যে ১ বছরে ৫২ জনের বহিষ্কার। বাংলাদেশের আর কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে এ রেকর্ড আছে কিনা আমার জানা নেই। এই নোটটার জন্য আমার উপর বহিষ্কারাদেশ চলে এসে কিনা তার নিশ্চয়তা নেই।আমি অন্য ডিপার্টমেন্টের ছাত্র, আমার এ বিষয় নিয়ে কথা বললে হয়ত সমস্যা হতে পারে, তবুও বিড়ালের গলায় কাউকে না কাউকে ঘণ্টা বাঁধতেই হবে।

ছাত্ররা নানা ভুল ত্রুটি করেছে। আপনারা সেসব কথা মিডিয়ার সামনে জোড় গলায় বলতে পারেন, কিন্তু আপনাদের অযোগ্যতার কথা কি আপনারা একবারও স্বীকার করেছেন?

একবার ভাবুন তো ঐ মায়ের কথা, যে তার সন্তানকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়েছে পড়াশুনা করার জন্য, কিন্তু সন্তান শিক্ষকদের করা মিথ্যা মামলায় চুরির দায়ে হাজতে রাত কাটাচ্ছে। তার জায়গায় নিজেকে একবার কল্পনা করুন। বিবেকের কাছে কি জবাব দেবেন?

ছাত্ররা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে ভয় পায়। আপনারা তাদের সেই ক্ষমতাটুকুও কেড়ে নিয়েছেন। ছাত্রদের প্রতি আমার আহ্বান, যেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কিছু করার থাকে না সেখানে তাকে নাকি ঘৃণা করতে হয়। আমরা তাদের বিরুদ্ধে কিছু করতে না পারি, তাদেরকে অন্তত সমর্থন না দেই, ঘৃণা করতে শিখি। আমারতো মনে হয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিবেক না থাকলেও আমাদের আছে। আমরা বিবেকের এ দায় এড়াব কিভাবে?

একটি মানচিত্রের গল্প ও অফটপিকের কিছু কথা


একটা গল্প বলেই শুরু করি।

একটা ৮-৯ বছরের বাচ্চা একটা কাগজের মানচিত্র নিয়ে খেলছে। খেলতে খেলতে সে মানচিত্রটা ছিড়ে ফেলেছে। তার বাবা এটা দেখে তো খুব রাগ করল। ছেলেটাকে বলল, তুমি মানচিত্রটি ছিড়লে কেন? এখন তোমাকে আধঘণ্টা সময় দিচ্ছি, তুমি যেভাবে পার মানচিত্রটা জোড়া দাও। ছেলে তো পড়ল মহা বিপাকে।

আধঘণ্টা পর বাবা এসে দেখে ছেলেটা ঠিকই মানচিত্রটা জোড়া দিয়ে ফেলেছে। বাবা তো অবাক! বাবা জিজ্ঞেস করল, তুমি তো মানচিত্রটা চেনো না, তুমি এটা জোড়া দিলে কিভাবে? ছেলে বলে, বাবা, আমি মানচিত্র জোড়া দেই নি, মানচিত্রের পেছনে একটা মানুষের ছবি ছিল, আমি সেই ছবিটা জোড়া দিয়েছি, মানচিত্র এমনিতেই জোড়া লেগে গেছে।

গল্প শেষ। এবার আমি আমার মূল টপিকে ফিরে আসি। অনেকেই বলে আমি তো চুনোপুঁটি, আমি দেশের কাজে কিভাবে লাগতে পারি। তাদের জন্যে উপরের গল্পটা। আমার কথা হচ্ছে তুমি নিজে নিজেকে গড়ে তোল, দেখবে দেশটা ঠিকই গড়ে উঠেছে।

আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছি নিজেকে একজন পূর্নাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য। আমি দিন-রাত পড়াশুনা করবো, একাডেমিকালি ভালো ফলাফল করবো, কিন্তু আমার ভিতরে মানবিক গুনাবলি পরিস্ফুটিত হবে না, তাহলে সে শিক্ষার আদৌ কি কোনো মূল্য আছে? মনিষী প্রমথ চৌধুরী বলেছেন-

“শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে মূল্যবোধের পরিবর্তন।”

জ্ঞানের কথা একটু বেশিই হয়ে যাচ্ছে। আমি আমার কথায় ফিরে আসি।

আমি শুধু পড়াশুনা করেই যাব, আর আমার চোখের সামনে দিয়ে অন্যায় হয়ে যাবে আর, আমি তার প্রতিবাদ করবো না তা হলে তো আমার পড়াশুনাই বৃথা। আমি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে শুধু ভুলই করিনি, আমি অপরাধ করেছি। সরকার আমার পেছনে চার বছরে ৭-৮ লাখ টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে, আমি আমার দেশকে কি দিচ্ছি? আমি এ সিটটিতে ভর্তি হওয়ার কারনে আর একটা ছেলে বঞ্চিত হয়েছে।

আবার মানচিত্রের গল্পে ফিরে আসি। আমি যদি আমার নৈতিক শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিয়ে জেতে না পারি, তাহলে মানচিত্রের পেছনের মানুষটাকে আমি জোড়া দিতে পারব না। তার চোখদুটোকে আমি অন্ধ করে ফেললাম। সে তার সামনে ঘটে যাওয়া অন্যায়-অপরাধ কিছুই দেখতে পারবে না। এতে দেশের মানচিত্র ফুটো হয়ে যাবে। বাংলাদেশ তো আর এমনি এমনি দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয় নি।

ভিসি স্যার প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস না করালে দেশের ক্ষতি হয়, আমি একটা ক্লাস না করলে দেশের ক্ষতি হয়, ফুড ডিপার্টমেন্টের ছেলেরা ১১ মাস ক্লাস না করলে দেশের ক্ষতি হয়, কিন্তু আমি যদি নৈতিকতা না শিখি তাহলে কি দেশের ক্ষতি হয় না? কোনটা বড়, ১ ঘণ্টার একটা ক্লাস না করা নাকি ২৫-৩০ বছরের কর্মজীবনে দুর্নীতি করে যাওয়া। দেশের বড় ক্ষতি কে করছে, আমি, যে একটা ক্লাস না করে অপরাধ করেছি নাকি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, যারা আমাকে নৈতিকতার শিক্ষা থেকে বঞ্ছিত করছে? দেশের এত বড় ক্ষতি করার পর তারা বিবেকের কাছে কি জবাব দেবে? নাকি বিবেক নামক বস্তুটার সাথে তাদের পরিচয় নেই?

বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন অনিয়ম দেখলে আমার খারাপ লাগে। প্রতিবাদ করতে ইচ্ছে করে। কিন্তু আমি কিছু বললেই ওই একই প্রশ্ন-

“তোমার আইডি কত?”

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৭০০ ছাত্রের মধ্যে ১ বছরে ৫২ জনের বহিষ্কার। বাংলাদেশের আর কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে এ রেকর্ড আছে কিনা আমার জানা নেই। প্রশাসন তার অযোগ্যতা ঢাকার জন্য বহিষ্কারাদেশ দিয়েই যাচ্ছে। এই নোটটার জন্য আমার উপর বহিষ্কারাদেশ চলে এসে কিনা তার নিশ্চয়তা নেই। তবুও বিড়ালের গলায় কাউকে না কাউকে ঘণ্টা বাঁধতেই হবে।

যেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কিছু করার থাকে না সেখানে তাকে নাকি ঘৃণা করতে হয়। আমরা তাদের বিরুদ্ধে কিছু করতে না পারি, তাদেরকে অন্তত সমর্থন না দেই, ঘৃণা করতে শিখি। আমারতো মনে হয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিবেক না থাকলেও আমাদের আছে। আমরা বিবেকের এ দায় এড়াব কিভাবে?